যেসব নারীর ঋতুচক্র বন্ধ হয়ে গেছে, তাঁরা যদি দৈনিক এক ঘণ্টা করে হাঁটেন, তবে তাঁদের স্তনক্যানসারের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে। সম্প্রতি এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। আজ শুক্রবার বিবিসির অনলাইনের খবরে এ কথা জানানো হয়।খবরে বলা হয়, ‘ক্যানসার এপিডেমিওলজি, বায়োমেকারস অ্যান্ড প্রিভেনশন’ নামের একটি সাময়িকীতে এ-সংক্রান্ত এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, গবেষণার জন্য ১৯৯২-৯৩ সালের দিকে ৯৭ হাজার ৭৮৫ জন নারীর ওপর জরিপ করে র্যাম্বলার্স নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ওই নারীদের গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করে আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটি। এদের মধ্যে ৭৩ হাজার ৬১৫ জন নারীর বয়স ছিল ৫০ থেকে ৭৪ বছরের মধ্যে। এসব নারীকে তাঁদের স্বাস্থ্যসম্পর্কিত বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। প্রশ্নের মধ্যে ছিল হাঁটা, সাঁতার কাটা, অ্যারোবিকসের মতো শারীরিক কসরতের পেছনে তাঁরা কতটা সময় ব্যয় করেন আর টেলিভিশন দেখা ও বই পড়ায় কতটা সময় অতিবাহিত করেন। ১৯৯৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে দুই বছর পর পর আবারও এই একই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় তাঁদের।
এ গবেষণায় দেখা যায়, যেসব নারী প্রতি সপ্তাহে সাত ঘণ্টা করে হাঁটেন, তাঁদের স্তনক্যানসারের ঝুঁকি ১৪ শতাংশ কমে যায়।
গবেষক দলটির প্রধান ডা. অল্পা প্যাটেল জানান, হাঁটাহাঁটি ছাড়াও বেশি বেশি শারীরিক পরিশ্রমসাধ্য কাজে এই ঝুঁকি আরও কমতে পারে।
স্তনক্যানসার ক্যাম্পেইনের প্রধান নির্বাহী ব্যারোনেস ডেলিথ মরগান বলেন, এ গবেষণায় এটাই প্রমাণিত যে জীবনযাপনে সামান্য পরিবর্তন আনলেই স্তনক্যানসার মোকাবিলায় বড় ধরনের সাফল্য আসতে পারে।
পরীক্ষা করেছেন তো?
স্তন ক্যানসার নিয়ে সচেতনতা বাড়ছে ধীরে ধীরে। তবু সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় না হওয়ায় জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে এটি। তাই প্রতি মাসে একবার নিজের স্তন নিজে পরীক্ষা করতে হবে। ২০ বছর বয়স থেকে এ পরীক্ষা করা উচিত। আর প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় করার প্রথম ধাপ নিজের স্তন নিজে পরীক্ষা করতে জানা।
স্তন ক্যানসারের প্রথম উপসর্গ স্তনে বা বগলে চাকা। প্রাথমিক অবস্থায় ৯৫ শতাংশ রোগীর স্তনের চাকায় কোনো ব্যথা থাকে না। অন্য কোনো উপসর্গ না থাকায় বেশির ভাগ রোগীই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর দেরি করে ফেলেন। তত দিনে স্তনের চাকা বড় হয়ে যায়, স্তনের ওপরের ত্বক ও বগলের গ্রন্থিতে ছড়িয়ে পড়ে।
নিজে কীভাবে স্তন ক্যানসার পরীক্ষা করবেন
এই পরীক্ষা করতে সময় লাগে ১৫ মিনিট। প্রয়োজন একটি নিরিবিলি ঘর ও বড় আয়না। ঋতুচক্র শেষ হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে এ পরীক্ষা করলে সবচেয়ে ভালো হয়। কারণ, সে সময় স্তন কিছুটা হালকা থাকে। মেনোপজ হয়ে গেছে কিংবা জরায়ুর অস্ত্রোপচার হওয়া নারীরা মাসের যেকোনো দিন এ পরীক্ষা করতে পারেন। তবে মনে রাখার জন্য একটি তারিখ নির্ধারণ করতে পারেন।
আয়নার সামনে
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পর্যাপ্ত আলোয় কাপড় সরিয়ে নিজেকে ভালোভাবে লক্ষ করতে হবে। প্রথমে দুই বাহু দেহের দুই পাশে ঝুলিয়ে দাঁড়াতে হবে। তারপর দুই বাহু মাথার ওপর উঁচু করতে হবে। এবার দুই হাত কোমরে চেপে দাঁড়াতে হবে, যাতে বুকের মাংসপেশি টানটান হয়। হালকা করে স্তনের বৃন্ত চেপে দেখতে হবে।
লক্ষ করার বিষয়
স্তনের আকার-আকৃতি ও রঙের পরিবর্তন আছে কি না।
স্তনের ত্বক কমলার খোসার মতো পুরু হয়ে আছে কি না।
স্তনের বৃন্ত ভেতরে ঢুকে গেছে কি না।
স্তনের বৃন্ত থেকে নিঃসৃত তরলের রং কী?
হাত দিয়ে পরীক্ষা করা
বিছানায় শুয়ে ও গোসলের সময় সাবান মেখে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে স্তন পরীক্ষা করতে হবে। ডান স্তন পরীক্ষা করার সময় ডান হাত মাথার ওপর রেখে বাঁ হাত ব্যবহার করতে হবে এবং বাঁ স্তনের জন্য বাঁ হাত মাথার ওপর রেখে ডান হাত দিয়ে পরীক্ষা করতে হবে। মাঝের তিন আঙুল ব্যবহার করতে হবে। প্রথমে একটু হালকা চাপ, পরে আরও একটু ভারী চাপ এবং তৃতীয় পর্যায়ে বেশ জোরে চাপ দিয়ে স্তন টিস্যু-সংবলিত পুরো এলাকা পরীক্ষা করতে হবে। স্তন টিস্যুতে চাপ রাখা আঙুলের প্যাড (ঘুর্ণমান লাটিমের মতো) একটি অক্ষের ওপর কয়েকবার করে ঘুরিয়ে অনুভব করতে হবে। আয়নায় পর্যবেক্ষণ ও হাত দিয়ে পরীক্ষা করে যেকোনো পরিবর্তন ও চাকা লক্ষ করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, এ রোগের প্রথম শনাক্তকারী কেবল আপনি নিজেই হতে পারেন।
লেখক: অধ্যাপক, মেডিকেল অনকোলজি, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল
Prothom alo