শিক্ষার তরে আদম আলীর ছুটে চলা



কাকডাকা ভোরে ঘর থেকে বের হনটুক টুক করে লাঠিতে ভর দিয়ে বাড়ির পাশের বিদ্যালয়ে ঢোকেননিজ হাতে চেয়ার-টেবিল, বেঞ্চের ধুলাবালু সাফ-সুতরো করেন এক বিদ্যালয়ের কাজ শেষ হলে যান পাশেরটিতেদেখতে দেখতে বেলা বাড়েশিশুরা বিদ্যালয়ে আসতে শুরু করেতাদের সঙ্গে কথা বলেন, অভাব-অভিযোগ শোনেনকেউ হয়তো বেতন দিতে পারছে না, কারও হয়তো ফরম পূরণের টাকা নেইসাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেনদূরদূরান্ত থেকে আসা শিশুদের কষ্ট লাঘবে দুটি টমটম কিনে দিয়েছেননিজ সন্তানের মতো শিশুদের, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আগলে রাখেন তিনি
শিক্ষার আলো ছড়াতে সেই তরুণ বয়স থেকে তিনি গোটা সাতেক বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসা গড়ে তুলেছেন নিজ গ্রামেএলাকায় আরও পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়তে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছেননিজের গড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে উচ্চশিক্ষিত হয়েছেননাতি-নাতনিদের সঙ্গে বিএ, এমএ পাস করে শেষ বয়সে করেছেন শিক্ষকতাগাঁয়ের মানুষের দাবি রাখতে হয়েছেন জনপ্রতিনিধিএলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গ্রামপুলিশের কাজও করেছেনমানুষের সেবায় দরদি এই শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবীর নাম আদম আলী (৮৬)বাড়ি পটুয়াখালী সদর উপজেলার কমলাপুর ইউনিয়নের মধ্য ধরান্দি গ্রামে
পড়ার জন্য লড়াই: আসল নাম তাঁর নূরুল ইসলাম হাওলাদারতবে সবাই তাঁকে আদম আলী নামেই চেনেপটুয়াখালী শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার পূর্বে তাঁর বাড়িবাবা করিম উদ্দিন হাওলাদার ছিলেন সম্পন্ন কৃষকজীবনের শুরুটা সম্পর্কে জানতে চাইলে আদম আলী বলেন, ‘ছোট থাকতে বাবা বাড়ির কাছারিঘরে একজন শিক্ষক রেখে লেখাপড়ার ব্যবস্থা করেছিলেনসেই শিক্ষকের কাছে বছর তিনেকের মধ্যে প্রাইমারি শেষ করিধারেকাছে বিদ্যালয় না থাকায় পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়
আদম আলী জানান, তখন ব্রিটিশ আমলগোটা এলাকা ছিল জঙ্গলাকীর্ণযাতায়াত বলতে ছিল শুধু নৌকাকাছেই পটুয়াখালী মহকুমা শহরে যেতে নৌকায় প্রায় এক দিন লেগে যেতমানুষ ছিল কমদু-দশ মাইলের মধ্যে কোনো বিদ্যালয় ছিল নাতবে থেমে যাননি তিনিবাবার প্রেরণায় মাইল পাঁচেক দূরের এক পাঠশালায় ভর্তি হন সেখানে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার ব্যবস্থা ছিলতাই দুই বছরের মাথায় আবারও লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেলকিন্তু পড়ার প্রতি আগ্রহ দেখে বাবা তাঁকে পাশের গলাচিপা থানার খারিজ্জমা এম ই বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেনসেখানে সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত পড়লেনএরপর আবার বিদ্যালয় পাল্টে পটুয়াখালী মহকুমা শহরের জুবিলী উচ্চবিদ্যালয়েকিন্তু শহরে থাকার ব্যবস্থা না থাকায় সেখানে লেখাপড়া স্থায়ী হয়নিনবম শ্রেণীতেই পড়াশোনা একপ্রকার বন্ধ হয়ে যায়একদিন কাউকে কিছু না বলে চলে যান ঢাকা শহরেসে ১৯৪৭-৪৮ সালের কথাসদরঘাটের কাছে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হনচিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা শুরু করেনমাস কয়েকের মধ্যে ঢাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েপড়ার পাট চুকিয়ে ফেরেন বাড়ি
অন্য জীবন: বাড়ি ফিরে কৃষিকাজে জড়িয়ে পড়েন১৯৪৮ সালের শেষ দিকে বিয়ে করেন ১৯৫৫-৫৬ সালের দিকে গ্রামে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে হঠাৎবেড়ে যায় চুরি-ডাকাতি, খুন-খারাবিআইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গ্রামপুলিশের চাকরি নেন গাঁয়ের বাড়ি বাড়ি ঘুরে গোটা এলাকায় শান্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন১৯৫৭ সালে আকসিঞ্চকভাবে গাঁয়ে কলেরা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েএক রাতের ব্যবধানে আদম আলীর বাবা-মাসহ পরিবারেরই সাতজন মারা যানপুরো বাড়িতে মারা যান আরও ৪৬ জনএতগুলো মৃত্যু পাল্টে দেয় তাঁকেতাঁর মনে হতে থাকে, গ্রামের মানুষগুলো যদি একটু শিক্ষিত হতো, তাহলে নিশ্চয়ই কলেরায় এতগুলো মানুষের মৃত্যু হতো না
লেখাপড়ায় এগিয়ে চলা: এরপর নিজের শিক্ষার পাশাপাশি তিনি গাঁয়ের মানুষের কাছেও শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেনবাড়ির পাশে নিজের জমিতে স্থাপন করেন একটি জুনিয়র স্কুলঅনেক দৌড়ঝাঁপ করে ১৯৬০ সালে বিদ্যালয়টিকে পূর্ণাঙ্গ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে রূপ দেনসেই বিদ্যালয়ে নিজ সন্তানদের বয়সী ছাত্রছাত্রীদের সহপাঠী হনতখন তাঁর বয়স ৪০ ছাড়িয়ে গেছেএ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘লেখাপড়ার কোনো বয়স নেইশিক্ষা একটি আদর্শ, যা ধারণ করতে হয়
১৯৬৭ সালে ৪৪ বছর বয়সে পটুয়াখালী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি, ১৯৭২-এ প্রায় ৫০ বছর বয়সে বিএ পাস করেন তিনি১৯৭৪ সালে বরিশাল কলেজে ইতিহাস বিষয়ে এমএ ভর্তি হনএকই সঙ্গে আইন কলেজেও ভর্তি হন তিনিএর এক বছর পর নিজের গড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেন
শিক্ষার আলো ছড়াতে গ্রামেই আদম আলী প্রতিষ্ঠা করেন ইসলামপুর দাখিল মাদ্রাসা, বোয়ালিয়া বাগেনেছা দাখিল মাদ্রাসা, চৌদ্দপুরিয়া সিনিয়র মহিলা মাদ্রাসা ও কলাগাছিয়া ওমর ফারুক দাখিল মাদ্রাসাএ ছাড়া বাড়ির সামনে গড়ে তোলেন ধরান্দি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়, ধরান্দি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ধরান্দি কলেজনিজ টাকা, অন্যদের সহায়তা ও নিজের দান করা জমিতে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন
আদম আলী জানান, বিদ্যালয় দুটি ও কলেজে পড়তে আসা দূরের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে এক লাখ টাকায় দুটি টমটম কিনে দিয়েছেনএ ছাড়া পাশের জৈনকাঠি মাদ্রাসা ও লোহালিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ অন্তত এক ডজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় তিনি প্রত্যক্ষ অবদান রেখেছেনবর্তমানে তাঁর গড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেই তিন হাজারের বেশি ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করছে কর্মরত আছেন দুই শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারী
১৯৮২ সালে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচত হন আদম আলীচেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এলাকার মানুষের পীড়াপীড়িতে নির্বাচনে দাঁড়াতে হয়েছিলএতে আমার লাভ হয়েছেশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নে কাজ করতে পেরেছি
অন্যরা যা বলেন: কমলাপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবদুস ছালাম মৃধা বলেন, ‘আদম আলীকে নিয়ে আমরা গর্ববোধ করিতাঁর চেষ্টাতেই আজ শিক্ষার আলোয় আলোকিত আমাদের এই এলাকাআজকে শেষ বয়সে এসেও তিনি শিক্ষা বিস্তারে কাজ করে যাচ্ছেন
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও লাউকাঠি শহীদ স্মৃতি বিদ্যানিকেতনের সাবেক প্রধান শিক্ষক এম এ খালেক বলেন, ‘আদম আলীর জীবনটাই গল্পের মতোনিজের হাতে গড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজে শিক্ষিত হয়েছেনএলাকায় ছড়িয়েছেন শিক্ষার আলো, যা আমাদের অনুপ্রেরণা জোগায়
collection from Prothom alo 

No comments:

Post a Comment