প্রকৃতি সান্নিধ্য
পেতে কার না ভালোলাগে। তাইতো ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে অনেকেই
ছুটছেন প্রকৃতির কাছে। এ সংক্রান্ত আমাদের সংবাদদাতাদের পাঠানো
প্রতিবেদন- শেরপুর থেকে মো. মেরাজ উদ্দিন জানান, পবিত্র ঈদের আনন্দ
উপভোগ করতে পর্যটকদের ভিড়ে শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার গারো পাহাড়ের মধুটিলা ইকো
পার্ক মুখরিত। প্রকৃতির সান্নিধ্যে ছুটে এসেছেন অনেকে। দেশের উত্তর সীমান্তবর্তী শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি
গারো পাহাড় অবস্থিত। এ সৌন্দর্যকে ঘিরে ভ্রমণ পিপাসুদের
জন্য নালিতাবাড়ীর মধুটিলায় বনবিভাগ গড়ে তুলেছে চমৎকার এক ইকোপার্ক। এ ইকোপার্কে আসলে প্রাণ জুড়িয়ে দেয় পাহাড়ি সুন্দর ও শান্ত
পরিবেশ। এখানে একবার আসলে বারবার মন টানে এ
সৌন্দর্যকে উপভোগ করতে।
বাংলাদেশের নৈসর্গিক
সৌন্দর্যের অন্যতম লীলাভূমি গারো পাহাড়। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত সংলগ্ন শেরপুরের তিনটি উপজেলার বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে
অনুচ্চ এই পাহাড় শ্রেণী। আরো আছে হিজল-তমাল, শাল-শেগুনের শ্যামল ছায়ায় ঢাকা নয়ানাভিরাম বনাঞ্চল। তারই মাঝে গারো-কোচসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর বাড়িঘর। শান্ত প্রকৃতির সেই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ সৃষ্টি
করার জন্য বনবিভাগ এখানে গড়ে তুলেছে চমৎকার এক ইকোপার্ক। জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলাধীন গারো পাহাড়ের মধুটিলায় ৫শ’ একর বনভূমিতে গড়ে তোলা হয়েছে এই ইকোপার্ক। প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে নয়নকারা একটি গেইট, রেস্ট হাউজ, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, পানির লেক, শিশু পার্ক, মিনি চিড়িয়াখানা, প্যাডেল বোর্ড, হাতি, কুমির,
হরিণ, বাঘ, সিংহসহ বিভিন্ন প্রাণীর ভাস্কর্য, স্টার ব্রিজ ও অভ্যন্তরীণ সড়ক নির্মাণ। পর্যবেক্ষন টাওয়ারের উপরে উঠলে সমস্ত গারো পাহাড় অতি সহজেই চোখের সামনে ভেসে উঠে। দেখা যায় ভারতীয় সীমান্তবর্তী অঞ্চলকে। আর এ সৌন্দর্যকে উপভোগ করার জন্য প্রতিদিন দূর-দূরান্ত
থেকে হাজার হাজার নারী-পুরুষ, শিশু বেড়াতে আসেন এখানে। বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে প্রচুর দর্শনার্থী ভিড় করেন এখানে। সৌন্দর্য পাগল মানুষেরা প্রকৃতির সান্নিধ্যে কাটিয়ে যান
কিছুটা সময়। নয়নকাড়া এ সৌন্দর্য বারে বারে পিছু
টানে তাদেরকে। তাই এখানে আসলে কেউ সহজে যেতেই চায়
না। কেউ কেউ সৌন্দর্যের টানে প্রতিবছরই বেড়াতে আসেন এখানে। শুকনো মৌসুমে ছুটির দিনে বিশেষ করে শুক্র ও শনিবারে এখানে
দর্শনার্থীদের ঢল নামে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শত শত বাস-কোচ
মাইক্রোবাস যোগে হাজার হাজার দর্শনার্থী এখানে আনন্দ উপভোগ করতে আসছেন। দর্শনার্থীদের দাবি এ ইকোপার্কটিকে আরো উন্নয়ন করা হলে
এটি দেশের অন্যতম প্রধান আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার পারভিন জানান, তার এ জায়গাটা খুব ভালো লেগেছে। এই জায়গাটা ছেড়ে
তার যেতে ইচ্ছে করছে না। শেরপুর জেলা শহরের
গৌরীপুরের শেখ শাহরিয়ার আহম্মেদ শাকির জানান তারও এ জায়গাটা খুব ভালো লেগেছে। তবে সে আরো সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার দাবি জানায়। জামালপুর থেকে আগত শিক্ষক জাহঙ্গীর আলম জানান, এ ইকোপার্কটিকে আরো উন্নয়ন করে দেশের প্রথম শ্রেণীর পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করা
সম্ভব। আমরা সরকারের কাছে এটিকে আরো উন্নয়ন করার জন্য দাবি জানাই। এদিকে এই ইকোপার্ককে ঘিরে স্থানীয় লোকজন তাদের আয়ের নতুন
পথ খুঁজে পেয়েছে। তারা এখানে স্থানীয় উপজাতীয়দের হাতের
তৈরি পণ্যের দোকান সাজিয়ে তুলছে। কয়েকজন দোকানি জানান, তারা এখানে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করে সুখে-শান্তিতে সংসার চালাচ্ছে। শিশু করিম জানালো, সে শুধু পানি বিক্রি
করে মাসিক প্রায় ৩ হাজার টাকা আয় করে।
দর্শনার্থীদের এই
ইকোপার্কটি নজর কাড়তে সক্ষম হলেও এখানে আসার জন্য শেরপুরের ঝিনাইগাতীর তিনআনী বাজার
থেকে মধুটিলা ইকোপার্ক পর্যন্ত রাস্তাটির নন্নী বাজার পর্যন্ত রাস্তার দীর্ঘদিন ধরে
সংস্কারের অভাবে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ফলে যাতায়াতে দর্শনার্থীদের কিছুটা দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দর্শনার্থীদের দাবি দ্রুত এ সড়কটির সংস্কার করা হোক। এর ব্যাপারে শেরপুর থেকে আগত শিশু শেখ সঈদ আহাম্মেদ সাবাব
জানায়, তার এখানে আসতে খুব কষ্ট হয়েছে। তাই তাড়াতাড়ি রাস্তাটি ভালো করা দরকার। ময়মনসিংহ বনবিভাগের নালিতাবাড়ী মধুটিলা রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা জানান, সড়কটি উন্নয়নের দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে। ইতিমধ্যে এ ইকোপার্কটিকে প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। এটিকে আরো উন্নয়নের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এখান থেকে সরকার প্রতিবছর প্রায় ২৫-৩০ লাখ টাকা রাজস্ব
পায়। প্রতিবছর রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ এলাকার সৌন্দর্য প্রেমী মানুষের প্রত্যাশা, সৌন্দর্যে ম-িত এই ইকোপার্কটির আরো উন্নয়ন করে পরিণত করা হবে দেশের বৃহৎ পর্যটন
কেন্দ্রে।
মীরসরাই (চট্টগ্রাম)
থেকে আমিনুল হক জানান, চট্টগ্রামের রূপরাণী মীরসরাইয়ের মহামায়া
লেক এলাকায় এবার ইকোপার্ক ও পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরের জন্য ইজারা প্রদান করা হয় মাত্র
কয়েকদিন আগে। ইজারাপ্রাপ্ত মেসার্স আহসান ট্রেডিং
ইতিমধ্যে সেখানে গেইট ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যক্রম শুরু করেছে। এছাড়া পাবলিক টয়লেট, পার্কিং, ফুডকোড, রেস্তোরাঁ, এবাদতখানা নির্মাণ
কাজ শুরু হচ্ছে তাই নির্মাণাধীন উন্নয়ন কাজের চলমান প্রক্রিয়ার জন্য পর্যটকরা যথার্থ
বিনোদন না পেলে ও লেকের পাড়ে ও বোটে ঘুরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে ঈদের দিন বিকেল
থেকে দিনভর আগন্তুকদের আনাগোনায় মুখরিত পুরো লেক এলাকা। দূর থেকে শোনা যায় অপরূপ ঝর্ণার নূপুর ধ্বনি, পাহাড়িয়া সবুজ গাছের
সমারোহ অতিথি পাখিদের কলতান কার না মন জুড়ায় শিশু থেকে বৃদ্ধ যে কেউ মুগ্ধ হয় মহামায়া
প্রকল্প দেখে। সে যেন সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি পর্যটকদের
হাতছানি দিয়ে ডাকছে। ঈদ পরিবার-পরিজন নিয়ে অপরূপ এ সৌন্দর্য
উপভোগ করতে প্রতিদিন আসছে হাজার হাজার দর্শনার্থী।
চট্টগ্রাম শহর থেকে
৪৫ কিলোমিটার উত্তরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের
মিরসরাইয়ের ঠাকুরদিঘী বাজার থেকে দেড় কিলোমিটর পূর্বে পাহাড়ের পাদদেশে এ স্পটের অবস্থান। নীল আকাশের বিশালতার নিচে সবুজের সমারোহ। এ যেন প্রকৃতির লীলা খেলা। দু’পাশে থাকা বনাঞ্চলের
দিকে তাকালে হয়তো সহজেই দেখা যায় অনেক জীব বৈচিত্র্য। শেষ বিকেলের সূর্যের আলো যখন লেকে পড়ে তখন দূর থেকে মনে হয় পুরো প্রকল্পটির অপরূপ
দৃশ্য। মনোমুগ্ধ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের চাদরে ঢাকা প্রকল্পটিতে
ঝর্ণার পানি আছড়ে পড়েছে। চিকচিক বালিতে যেন
সকালের মিষ্টিরোদ আলো ছড়ায় আর অস্তগামী সূর্যের লালিমাখা অনন্ত ছায়া যেন ঢেলে দেয় দিগন্ত
জুড়ে। অপরূপ মহামায়া স্বর্ণালী স্বপ্নের মতোই বর্ণালী শোভা
ঘেরা সৌন্দর্য পিপাসু পর্যটন। ২০১০ সালের ২৯ ডিসেম্বর
প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। এখানে এলেই মহামায়া মনমোহনীরূপ দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ঘুরতে আসা শত শত পর্যটকের একটাই কথা এত চমৎকার মীরসরাইয়ে
হবে কখনো কেউ ভাবতেও পারেনি। এত চমৎকার দৃশ্য
সবারই মন জুড়াবে দূর থেকে দেখা যায় প্রায় পাহাড়সম বাঁধ। উভয় পাশে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। বাঁধে উঠতেই...!
আহ, কি অপরূপ শোভা। বাঁধের ধারে অপেক্ষমান সারি সারি ডিঙি নৌকো আর ইঞ্জিনচালিত বোট। ১১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের লেক কেবল সোভা ছড়ায়। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে স্বচ্ছ পানিতে তাকাতেই দেখা যায় নীল
আকাশ। পূর্ব-দিগন্তের সারি পাহাড়ের বুক চিরে যেতে যেতে এক সময়
হারিয়ে যেতে মন চাইবে কল্পনায়! এ সময় যদি প্রিয় মানুষটি পাশে থাকে তাহলে তো কথাই নেই!
পরিবার-পরিজন নিয়ে গেলেও নেই মানা। কিছু দূরেই দেখা
যাবে পাহাড়ের কান্না। অঝোরে কাঁদছে। অথচ তার কান্না দেখে নিজের কাঁদতে ইচ্ছে হবে না। উপরন্তু কান্নার জলে গা ভাসাতে মন চাইবে। তার পূর্বে যেখানে লেকের শেষ প্রান্ত সেখানেও বইছে ঝর্ণাধারা। মাঝপথে থেমে গিয়ে পাহাড়চূড়ায় উঠে নিজেকে ধন্য করতে পারেন। কেননা,
সেখান থেকে দেখা মিলবে দূরের পথ। এক কিলোমিটার দূরের মহাসড়ক, তার অর্ধেকের রেলপথ, ট্রেনের ছুটে চলা, কৃষাণীর ধান মাড়ানো, কৃষকের ফলন, কিশোরের দুরন্তপনা; সব-সবই দেখা মিলে চূড়া থেকে।

No comments:
Post a Comment